মালয়েশিয়ায় ৮৫ বাংলাদেশি শ্রমিকের মানবেতর রমজান: বকেয়া বেতন নিয়ে গড়িমসি

মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যে বেতন বকেয়া থাকায় ৮৫ জন বাংলাদেশি প্রবাসীর অনাহারে রমজান কাটানোর সংবাদে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় (কেসুমা) এবং মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন। বর্তমানে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে মালয়েশিয়ার শ্রম বিভাগ।

তদন্তের মুখে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘এসস্টার ভিশন’

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জাবাতান তেনাগা কেরজা সেমনাঞ্জুং মালয়েশিয়া (জেটিকেএসএম) এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এসস্টার ভিশন সেন্ডিরিয়ান বেরহাদ’ নামক একটি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ পরিচালিত এক তদন্তে দেখা যায়, কোম্পানিটিতে ১০৪ জন বাংলাদেশি এবং ৬৫ জন স্থানীয় কর্মী কাজ করেন।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেতন প্রদানে অনিয়ম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এই দীর্ঘ সময়ে বিপুল পরিমাণ বেতন বকেয়া পড়েছে।

শ্রম আদালতে একাধিক মামলা

জেটিকেএসএম-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালে নতুন করে ১৪টি শ্রম মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে ৮৬ জন বিদেশি এবং ৬ জন স্থানীয় কর্মী জড়িত। এসব মামলায় মোট দাবির পরিমাণ ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪১৪ রিঙ্গিত, যার সিংহভাগই (প্রায় ৫ লাখ ৭৮ হাজার রিঙ্গিত) বাংলাদেশি কর্মীদের পাওনা। ইতিমধ্যে ১৬টি তদন্ত নথি খোলা হয়েছে এবং আরও আটটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, শ্রম আইন লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা সরকার সহ্য করবে না এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের তৎপরতা

বাংলাদেশ হাইকমিশন জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি তারা ই-মেইলের মাধ্যমে প্রথম অভিযোগটি পায়। সেখানে ৮৫ জন কর্মীর চার মাসের বেতন বকেয়া এবং ছয়জনের ভিসা বাতিলের কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর ২৮ জানুয়ারি শ্রম দপ্তরের প্রথম শুনানিতে হাইকমিশনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

সমস্যা সমাধানে ১১ ফেব্রুয়ারি কোম্পানির সিইও ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে হাইকমিশন। কোম্পানিটি আর্থিক সংকটের কথা বলে কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। গত ৮ ও ৯ মার্চ হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিনে জোহর বারুতে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে দেখা করেন এবং কোম্পানিকে দ্রুত পাওনা পরিশোধের জন্য পুনরায় চিঠি দেন।

রমজানে চরম মানবিক সংকট

জোহর রাজ্যের পাসির গুদাং এলাকায় অবস্থানরত এই ৮৫ জন শ্রমিক বর্তমানে চরম খাদ্য সংকটে রয়েছেন। প্রায় ছয় মাস বেতন না পাওয়ায় তাদের সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে। গত জানুয়ারি থেকে কোম্পানি খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় পবিত্র রমজান মাসে তাদের কষ্ট আরও বেড়েছে।

শ্রমিকদের দাবি, তারা বর্তমানে স্থানীয় প্রবাসীদের দেওয়া জাকাত ও সহায়তার ওপর নির্ভর করে কোনোমতে বেঁচে আছেন। অনেক সময় শুধু পানি দিয়ে ইফতার এবং বাসি খাবার দিয়ে সেহরি সারতে হচ্ছে। যদিও কোম্পানির মুখপাত্র ল ইয়িক হুই দাবি করেছেন তারা সহায়তা দিচ্ছেন, তবে শ্রমিকরা তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

ভুক্তভোগী শ্রমিকরা দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং অন্য জায়গায় কাজের সুযোগ পেতে ‘রিলিজ লেটার’ প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *